উইপোকা দমনের প্রাকুতিক উপায়
উইপোকার জীবনচক্র (Termite life cycle)
উইপোকার পরিচিতি: হালকা হলুদ বা ফ্যাকাশে রঙের নরম দেহবিশিষ্ট Isoptera বর্গের এক দল সামাজিক পতঙ্গ। উইপোকা প্রধানত গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশসমূহে বাস করে। অধিকাংশই ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি আকারের, লম্বায় ৪-৫ মিমি; তবে গ্রীষ্মমন্ডলের কোনো কোনো রানী উই ৭০ মিমি পর্যন্ত লম্বা হয়।উইপোকা পৃথিবীতে এসেছে পিঁপড়ার চেয়ে অনেক আগে, আজ থেকে প্রায় ২০ কোটি বছর আগে। এদের জীবাশ্ম সংগৃহীত হয়েছে প্রায় ১২ কোটি বছর পূর্বের ক্রিটাসিয়াস যুগের শিলা থেকে। দেহের গঠনেও পিঁপড়া আর উইপোকার মধ্যে পার্থক্য আছে। পিঁপড়াদের পেটের গোড়ার দিকে থাকে কোমরের মতো একটি অংশ যা উইপোকাতে নেই। উইপোকার শরীর নরম, মাথা ছাড়া দেহের বাকি অংশের রং হালকা হলুদ, আর পিঁপড়ার শরীর শক্ত, রং গাঢ়।
উইপোকার প্রকাভেদ: এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে উইপোকাদের প্রায় ১৯০০ প্রজাতির বর্ণনা হয়েছে।
উইপোকার অপকারিতা:
প্রতি বছর সারা বিশ্বে উইপোকারা প্রায় চল্লিশ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করে থাকে। বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে ৩৫ টি দেশের প্রায় ১২৫ বিজ্ঞানীর চেষ্টার পরেও উইপোকা দমনের জৈব পদ্ধতি বের করা সম্ভব হচ্ছিল না। নিজেদের রক্ষার বিভিন্ন উপায় রয়েছে তাদের শরীরে। এ ব্যাপারে জানার জন্য এই গবেষকরা Formosan subterranean
termite (Coptotermes formosanus) নামের উইপোকার
জাতটি বেছে নেন। সারা বিশ্বে উইপোকা দিয়ে যত ক্ষতি হয় তার মাঝে সবচাইতে বেশি কুকর্ম করে থাকে এই জাতটিই। এগুলো মাটির নিচে বাসা বানায় যাতে এক মিলিয়ন পর্যন্ত উইপোকা বাস করতে পারে। এই বাসার টানেলগুলো হতে পারে ৪৯০ ফুট পর্যন্ত লম্বা! এরা বাসা বানানোর জন্য নিজের বর্জ্য মেশায় চিবানো কাঠের সাথে। এছাড়া এই বর্জ্য দিয়ে তারা টানেলের দেয়াল লেপে দেয়। গবেষকরা ধারণা করেন
এই বর্জ্য লেপার মাধ্যমে তারা নিজেরাই এক ধরণের উপকারী জীবাণুর চাষ করে। গবেষকরা ফ্লোরিডার পাঁচটি উইপোকা বসতি থেকে এই জীবাণু সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, এর মাঝে ৭০ ভাগ জীবাণুই উইপোকার জন্য ক্ষতিকর ছত্রাক এবং ব্যাকটেরিয়ার বিপক্ষে কাজ করে! উইপোকারা নিজেদের পেটে কাঠ হজম করার জন্য জীবাণুর সাহায্য নেয়। তারা যে রোগবালাই দমনের জন্য নিজেদের বাড়িতে জীবাণুর চাষ করে সেটা এবার দেখা গেলো। গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা উইপোকার নকল বাসা তৈরি করেন এবং এতে উইপোকা ছেড়ে দিয়ে তাদের জন্য ক্ষতিকর একটি ছত্রাক প্রবেশ করানো হয়। দেখা যায়, যেসব বাসার দেয়ালে ওই উপকারী জীবাণু দেওয়া হয়েছিল সেসব বাসার উইপোকারা বেঁচে যায়।
বাড়ির
জিনিসপত্রকে
অনেক সময়ই নষ্ট করে নানা কীটপতঙ্গ। বিশেষ করে, বইখাতা বা কাঠের জিনিসে একবার উইপোকা ধরলে তা থেকে নিস্তার পাওয়া দুষ্কর। এ দিকে বাড়িতে কাগজপত্র বা কাঠের জিনিসপত্র রাখতেই হয়। তাই এর ভয় থেকে গৃহস্থ মুক্ত হতে পারেন না একেবারেই।
সচরাচর
সাধারণ কোনও কীটনাশকে এই
পোকা সম্পূর্ণ নির্মূল হয় না। কারণ এ সবের
ফলে সাময়িকভাবে উইপোকা দূর হলেও
আবারও তা ফিরে আসে।
তা ছাড়া এই সব
রাসায়নিক শিশুদের শরীরের জন্যও ক্ষতিকারক।
শ্বাসের মাধ্যমে এই রাসায়নিক শরীরে
প্রবেশ করলে তা খুব
একটা স্বাস্থ্যকর নয়।
অনেকেরই
ধারণা কেবলমাত্র স্যাঁতসেতে দেওয়ালের কারণেই বোধ হয়
উইপোকা বাসা বাঁধে। তাই
বাড়ি প্লাস্টার করার সময় স্যাঁতসেতে
ভাব প্রতিরোধক রাসায়নিকও মেশান অনেকেই। কিন্তু
বাস্তবিক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এ
সব উপায়ও উইপোকার আক্রমণ
পুরোপুরি ঠেকাতে পারা যায়
না। বরং এর সঙ্গে
লড়তে গেলে ধারাবাহিক কিছু
অভ্যাস আয়ত্তে রাখতে হয়।
জানেন সে সব কী
কী?
১. উইপোকা তাড়াতে কার্পূরের ব্যবহার: যে দেওয়ালে
উইপোকার আক্রমণ বেশি, সেখানে
কর্পূরের গুঁড়া ও তরল
প্যারাফিন মিশিয়ে একটি দ্রবণ
তৈরি করুন। দিন চার-পাঁচ অন্তর তা
লাগিয়ে রাখুন দেওয়ালের কোণায়।
২. উইপোকা তাড়াতে নিমপাতারব্যবহার: নিমপাতা
শুকিয়ে গুঁড়া করে নিন।
বইয়ের আলমারির তাকে, বা কাঠের
আসবাবের কোণায় মাঝে মাঝেই
ছড়িয়ে দিন তা। নিম
পাতার গন্ধ উইপোকা সহ্য
করতে পারে না।
৩. দীর্ঘ দিনের রাখা কাগজপত্র নাড়াচাড়ার মাধ্যমে উইপোকা তাড়ানো: কাগজপত্র
দীর্ঘ দিন একই জায়গায়
ফেলে রাখবেন না। মাঝে
মাঝেই তা নাড়াচাড়া করুন।
রীতিমতো নাড়াচাড়া করা হয়, এমন
জায়গায় কখনও বাসা বাঁধে
না উইপোকা।
৪.উইপোকা তাড়াতে ন্যাপথলিনের বল ব্যবহার: ন্যাপথলিনের
বল রেখে দিন বইয়ের
আলমারিতে। কাঠের ডেস্কের ভিতর
বা আলনার কোণাতেও রাখুন
ন্যাপথলিন বল। এর কড়া
কীটনাশকের গন্ধ উইপোকাকে ঘেঁষতে
দেয় না।
৫. উইপোকা তাড়াতে কালো জিরা ব্যবহার: কালো
জিরা যে কোনও কীট
দমনে ওস্তাদ। বিশেষ করে বই
কাটে যে সব পোকা,
তাদের ক্ষেত্রে কালো জিরা খুব
ভাল সমাধান। প্রতিটা বইয়ের নানা পাতার
ভাঁজে অল্প কয়েকটা কালো
জিরা রাখুন। ফল মিলবে
হাতেনাতে।
ঘরোয়া
উপায়ের পরেও আরও বাড়তি
সতর্কতা নিতে চাইলে হার্ডওয়ারের
দোকানে উইপোকা ঠেকানোর রাসায়নিকের
খোঁজ করতে পারেন। তবে
এ সব রাসায়নিকের চেয়ে
ঘরোয়া উপায় পকেটসই ও
স্বাস্থ্যকর।
·
সমপরিমাণ ভিনেগার ও পানি মিশিয়ে সলিউসন তৈরি করে যেখানে উইপোকার আনাগোনা বেশি সেখানে স্প্রে করে দিন। দূর হবে উইপোকা।
·
পানি ও লেবুর রস মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করুন। স্প্রে বোতলে নিয়ে ছিটিয়ে দিন। লেবুর সাইট্রিক এসিড ধ্বংস করবে উইপোকা।
·
কাঠের আসবাবে উইপোকা বাসা বাধলে কড়া রোদে দিন আসবাব। উইপোকা থাকবে না।
সম্পূর্ণ ভাবে দুর করতে চিটাগাং পেস্ট কন্ট্রোল-এ যোগাযোগ করতে পারেন। এতকিছু করেও যদি সফল না হন অথবা আপনার সময় না থাকে তবে যোগাযোগ করতে পারেন চিটাগাং পেস্ট কন্ট্রোল এর সাথে অথবা ০১৬৩৪৯০২২৩৫ নম্বরে।
বি:দ্র: পরিক্ষার পরিছন্নতার কোন বিকল্প নেই।
চা-বাগানের শত্রু উইপোকা।
আর তা নিধন করতে পারলে উৎপাদনও বাড়ে।
এ জন্য সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো উইপোকার রানিকে ধ্বংস করা।
কিন্তু এই ‘সহজ’
কাজটি করাটাই কঠিন।
কারণ উইপোকার রানি খু্ব সহজে পাওয়াটাই কঠিন।
তাই কঠিন কাজটি বাদ দিয়ে বছরে তিনবার চা-বাগানে উইপোকানাশক রাসায়নিক দিয়ে বছর বছর উইপোকার বিরদ্ধে লড়াই করা বেশির ভাগ চা-বাগানের রীতি।
তবে সেই কঠিন কাজটি সহজ করে দিয়েছেন বিজ্ঞানী মাইনউদ্দীন আহমেদ। তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে সহজেই উইপোকার রানি খুঁজে বের করে নির্মূল করা যায়। এই পদ্ধতিতে রানি উইপোকার পছন্দের খাবার দিয়ে খাদ্য ফাঁদ (ফুড ট্র্যাপ) তৈরি করে মাটির কয়েক ফুট নিচে উইপোকার ঢিবি শনাক্ত করা হয়। এরপর কীটনাশক, গরম পানির মিশ্রণ দিয়ে রানি ধ্বংস করে উইপোকার পুরো আবাস নির্মূল করা সম্ভব হয়।
উইপোকার কলোনিতে শুধু একটিই রানি থাকে। যা অন্য সাধারণ উইপোকা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আকারে প্রায় ১০-১২ সেন্টিমিটার। এটি প্রতিদিন, অর্থাৎ প্রতি ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৮০ হাজার ডিম পাড়ে। একটি রানি উইপোকা প্রায় ৫০ বছর বাঁচে। উইপোকার সাম্রাজ্যে একক কেন্দ্র হলো এই রানি। একে চিহ্নিত ও ধ্বংস করতে পারলে উইপোকার পুরো কলোনিই নষ্ট করা সম্ভব। আলাদাভাবে বারবার উইপোকা মারার জন্য কীটনাশক প্রয়োগের আর প্রয়োজন থাকে না।
বিশিষ্ট চা গবেষক মাইনউদ্দীন আহমেদ বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। উইপোকা দমনে এই বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করে তিনি পেয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
মাইনউদ্দীনের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বা কৌশলগুলো হচ্ছে চায়ের কোন জাতে উইপোকা কম ধরে, তা খুঁজে বের করা। চায়ের নতুন আবাদ এলাকায় উইপোকা আছে কি না, থাকলে কী ধরনের উইপোকা আছে, তা শনাক্ত করা। এরপর চা-গাছ রোপণ। ভূমির গঠনশৈলী বুঝে কোন মাটিতে চা-গাছের কোথায় উইপোকা কেমন ধরে, তা বিবেচনায় রেখে নির্বাচিত জাত রোপণ করা। চায়ের প্রধানতম পোকা চায়ের মশা, লাল মাকড়সা (রেড স্পাইডার), উইপোকাসহ অন্যান্য ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও তা সরেজমিনে ব্যবহার করতেই মাইনউদ্দীনের আগ্রহ। তিনি সমন্বিত বালাইনাশক পদ্ধতি অবলম্বন করেন। এতে রয়েছে আবর্জনা পরিষ্কার ও সুষ্ঠু নালা তৈরি, উইপোকার জাত শনাক্ত এবং উইপোকাকে অন্য পোকা দিয়ে খাওয়ানো ইত্যাদি। এই কৌশলসমূহ উদ্ভাবন করেই তিনি দায়িত্ব শেষ করেননি। বিভিন্ন বাগান পরিদর্শন, চা-আবাদকারীদের নিয়ে কর্মশালা, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে তাঁর এই কৌশল পৌঁছে দিয়ে থাকেন।
উইপোকা দমনে মাইনউদ্দীনের নতুন কলাকৌশল চা উৎপাদনে ভালো ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতি ব্যবহার করে চা উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের আসাম রাজ্যের টোকলাই টি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের শতবর্ষ উৎসব উদ্যাপিত হয় ২০১১ সালের ২২ থেকে ২৪ নভেম্বর। ভারত ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ ২৭-২৮টি দেশের চা বিজ্ঞানী, গবেষক ও কর্মকর্তারা সম্মেলনে যোগ দেন। সেখানে মাইনউদ্দীন তাঁর গবেষণাপত্রে চা-বাগানে পোকামাকড় দমন ব্যবস্থাপনায় পরিবেশসম্মত উপায় সম্পর্কে তাঁর নিজের উদ্ভাবিত পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেন। সর্বমহলে তাঁর গবেষণাপত্র প্রশংসিত হয়। আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনে তিনি দ্বিতীয় পুরস্কারে ভূষিত হন।
উইপোকা ছাড়াও চা-গাছের শত্রু মশা, লাল মাকড় প্রভৃতি চায়ের উৎপাদন প্রায় ১৫ শতাংশ কমিয়ে দেয়। পোকামাকড় দমনে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করলে পরিবেশ দূষণ ও ব্যবহৃত রাসায়নিকের ঝুঁকি তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে খরচের বোঝা। বিজ্ঞানী মাইনউদ্দীনের আবিষ্কার এ দুই সমস্যার সমাধান এনে দিয়েছে। এখানেই তাঁর ব্যতিক্রমী অর্জন।
মাইনউদ্দীন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৫ সালে প্রাণিবিদ্যার কীটতত্ত্বে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও ১৯৯১ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইম্পেরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড মেডিসিন থেকে ফলিত কীটতত্ত্বে এমএস ডিগ্রি লাভ করেন। ‘চায়ের উইপোকা দমন কৌশল’ বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৯ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁর তত্ত্বাবধানে এমএস এবং এমফিল ডিগ্রি লাভ করেন। বতর্মানে তাঁর অধীনে তিনজন গবেষক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণারত আছেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রকাশনাপত্রে তাঁর ৫৯টি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রবন্ধ ও অন্য আরও ৩১টি বৈজ্ঞানিক প্রকাশনাসহ মোট ৯৪টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ‘টি পেস্ট ম্যানেজমেন্ট’ গ্রন্থটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, উজবেকিস্তান ও ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠের অন্তর্ভুক্ত।
মাইনউদ্দীন প্রথম আলোকে বললেন, ‘শিক্ষক বা গবেষক হব এ রকমই ইচ্ছা ছিল। আকাঙ্ক্ষা ছিল নীরবে-নিভৃতে, সৎ ও ভালোভাবে গবেষণা করা। যাতে আমার কাজ মানুষের কল্যাণে লাগে। আমি প্রতিষ্ঠানের কাজটাকে নিজের মনে করি। চায়ের সেবা করা মানে দেশকেই সেবা করা।’
তাই কঠিন কাজটি বাদ দিয়ে বছরে তিনবার চা-বাগানে উইপোকানাশক রাসায়নিক দিয়ে বছর বছর উইপোকার বিরদ্ধে লড়াই করা বেশির ভাগ চা-বাগানের রীতি।
তবে সেই কঠিন কাজটি সহজ করে দিয়েছেন বিজ্ঞানী মাইনউদ্দীন আহমেদ। তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে সহজেই উইপোকার রানি খুঁজে বের করে নির্মূল করা যায়। এই পদ্ধতিতে রানি উইপোকার পছন্দের খাবার দিয়ে খাদ্য ফাঁদ (ফুড ট্র্যাপ) তৈরি করে মাটির কয়েক ফুট নিচে উইপোকার ঢিবি শনাক্ত করা হয়। এরপর কীটনাশক, গরম পানির মিশ্রণ দিয়ে রানি ধ্বংস করে উইপোকার পুরো আবাস নির্মূল করা সম্ভব হয়।
উইপোকার কলোনিতে শুধু একটিই রানি থাকে। যা অন্য সাধারণ উইপোকা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আকারে প্রায় ১০-১২ সেন্টিমিটার। এটি প্রতিদিন, অর্থাৎ প্রতি ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৮০ হাজার ডিম পাড়ে। একটি রানি উইপোকা প্রায় ৫০ বছর বাঁচে। উইপোকার সাম্রাজ্যে একক কেন্দ্র হলো এই রানি। একে চিহ্নিত ও ধ্বংস করতে পারলে উইপোকার পুরো কলোনিই নষ্ট করা সম্ভব। আলাদাভাবে বারবার উইপোকা মারার জন্য কীটনাশক প্রয়োগের আর প্রয়োজন থাকে না।
বিশিষ্ট চা গবেষক মাইনউদ্দীন আহমেদ বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। উইপোকা দমনে এই বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করে তিনি পেয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
মাইনউদ্দীনের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বা কৌশলগুলো হচ্ছে চায়ের কোন জাতে উইপোকা কম ধরে, তা খুঁজে বের করা। চায়ের নতুন আবাদ এলাকায় উইপোকা আছে কি না, থাকলে কী ধরনের উইপোকা আছে, তা শনাক্ত করা। এরপর চা-গাছ রোপণ। ভূমির গঠনশৈলী বুঝে কোন মাটিতে চা-গাছের কোথায় উইপোকা কেমন ধরে, তা বিবেচনায় রেখে নির্বাচিত জাত রোপণ করা। চায়ের প্রধানতম পোকা চায়ের মশা, লাল মাকড়সা (রেড স্পাইডার), উইপোকাসহ অন্যান্য ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও তা সরেজমিনে ব্যবহার করতেই মাইনউদ্দীনের আগ্রহ। তিনি সমন্বিত বালাইনাশক পদ্ধতি অবলম্বন করেন। এতে রয়েছে আবর্জনা পরিষ্কার ও সুষ্ঠু নালা তৈরি, উইপোকার জাত শনাক্ত এবং উইপোকাকে অন্য পোকা দিয়ে খাওয়ানো ইত্যাদি। এই কৌশলসমূহ উদ্ভাবন করেই তিনি দায়িত্ব শেষ করেননি। বিভিন্ন বাগান পরিদর্শন, চা-আবাদকারীদের নিয়ে কর্মশালা, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে তাঁর এই কৌশল পৌঁছে দিয়ে থাকেন।
উইপোকা দমনে মাইনউদ্দীনের নতুন কলাকৌশল চা উৎপাদনে ভালো ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতি ব্যবহার করে চা উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের আসাম রাজ্যের টোকলাই টি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের শতবর্ষ উৎসব উদ্যাপিত হয় ২০১১ সালের ২২ থেকে ২৪ নভেম্বর। ভারত ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ ২৭-২৮টি দেশের চা বিজ্ঞানী, গবেষক ও কর্মকর্তারা সম্মেলনে যোগ দেন। সেখানে মাইনউদ্দীন তাঁর গবেষণাপত্রে চা-বাগানে পোকামাকড় দমন ব্যবস্থাপনায় পরিবেশসম্মত উপায় সম্পর্কে তাঁর নিজের উদ্ভাবিত পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেন। সর্বমহলে তাঁর গবেষণাপত্র প্রশংসিত হয়। আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনে তিনি দ্বিতীয় পুরস্কারে ভূষিত হন।
উইপোকা ছাড়াও চা-গাছের শত্রু মশা, লাল মাকড় প্রভৃতি চায়ের উৎপাদন প্রায় ১৫ শতাংশ কমিয়ে দেয়। পোকামাকড় দমনে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করলে পরিবেশ দূষণ ও ব্যবহৃত রাসায়নিকের ঝুঁকি তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে খরচের বোঝা। বিজ্ঞানী মাইনউদ্দীনের আবিষ্কার এ দুই সমস্যার সমাধান এনে দিয়েছে। এখানেই তাঁর ব্যতিক্রমী অর্জন।
মাইনউদ্দীন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৫ সালে প্রাণিবিদ্যার কীটতত্ত্বে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও ১৯৯১ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইম্পেরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড মেডিসিন থেকে ফলিত কীটতত্ত্বে এমএস ডিগ্রি লাভ করেন। ‘চায়ের উইপোকা দমন কৌশল’ বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৯ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁর তত্ত্বাবধানে এমএস এবং এমফিল ডিগ্রি লাভ করেন। বতর্মানে তাঁর অধীনে তিনজন গবেষক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণারত আছেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রকাশনাপত্রে তাঁর ৫৯টি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রবন্ধ ও অন্য আরও ৩১টি বৈজ্ঞানিক প্রকাশনাসহ মোট ৯৪টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ‘টি পেস্ট ম্যানেজমেন্ট’ গ্রন্থটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, উজবেকিস্তান ও ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠের অন্তর্ভুক্ত।
মাইনউদ্দীন প্রথম আলোকে বললেন, ‘শিক্ষক বা গবেষক হব এ রকমই ইচ্ছা ছিল। আকাঙ্ক্ষা ছিল নীরবে-নিভৃতে, সৎ ও ভালোভাবে গবেষণা করা। যাতে আমার কাজ মানুষের কল্যাণে লাগে। আমি প্রতিষ্ঠানের কাজটাকে নিজের মনে করি। চায়ের সেবা করা মানে দেশকেই সেবা করা।’
সম্পূর্ণ ভাবে দুর করতে চিটাগাং পেস্ট কন্ট্রোল-এ যোগাযোগ করতে পারেন। এতকিছু করেও যদি সফল না হন অথবা আপনার সময় না থাকে তবে যোগাযোগ করতে পারেন চিটাগাং পেস্ট কন্ট্রোল এর সাথে অথবা ০১৬৩৪৯০২২৩৫ নম্বরে।
Comments
Post a Comment